1. admin@lakshmipurdiganta.com : dipu :
  2. mostaqlp@gmail.com : লক্ষ্মীপুর দিগন্ত : লক্ষ্মীপুর দিগন্ত
  3. shafaatmahmud4@gmail.com : Shafaat Mahmud : Shafaat Mahmud

শহীদ ডা. ফয়েজ আহমদ, কত কথা কত স্মৃতি

  • আপডেট সময় শনিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৩৪০ দেখা হয়েছে

শহীদ ডা. ফয়েজ আহমদ, কত কথা কত স্মৃতি

-এস ইউ এম রুহুল আমিন ভূঁইয়া

লক্ষ্মীপুরের লক্ষ্মী গাঁয়ের সৌভাগ্যবান সন্তান শহীদ ডা. ফয়েজ আহমদ। আন্দোলনের যেকোনো কর্মীর জন্য শহীদ ফয়েজের সাহচর্য ছিলো এক পরম পাওয়া। আল্লাহর শুকরিয়া আমি দীর্ঘদিন এক সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ডা. ফয়েজকে নিয়ে আমায় কলম ধরতে হবে তা কখনো কল্পনা করিনি। আমাকে যখন বলা হলো শহীদ ফয়েজ ভাইকে নিয়ে লিখার জন্য, তখন আমি বললাম স্মারক কত পেইজের হবে, আমার জীবন জুড়েই তো ফয়েজ ভাইয়ের স্মৃতি। অজস্র স্মৃতি। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৮৮ সালে, স্ত্রীর অসুস্থতা জনিত কারণে তাঁর চেম্বারে যাওয়া, তখনো আলোর দিশা পাইনি, আন্দোলনে যোগদানের পর থেকে তাঁর সাথে আমার জীবনের অব্যাহত পথচলা শুরু। আমার বয়োজেষ্ঠ্য ডা. ফয়েজ লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী (২০০২-২০০৯) এবং শাহাদাতের আগমুহুর্ত পর্যন্ত তিনি নায়েবে আমির (২০০৯-১৩) এর দায়িত্ব পালন করেন।

সুদীর্ঘ এই সময়ে জেলা আমীর হিসেবে আমার প্রতি উনার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, মমত্ববোধ আমাকে প্রতিনিয়ত অবাক করতো। ডা. ফয়েজকে নিয়ে আমার ভালোবাসার মুহুর্ত স্মরণ করতে গেলে আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি, আজ নিজেকে অনেক বেশি ভাগ্যবান মনে হয়।

লক্ষ্মীপুরের একজন জনপ্রিয় চিকিৎসক ছিলেন ডা. ফয়েজ, শুধুমাত্র শরীরবৃত্তিয় রোগের চিকিৎসক ছিলেন না তিনি, জনশক্তির হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে মানসিক উৎকর্ষ সাধনে সদা সচেষ্ট ছিলেন। আন্দোলনের যেকোনো প্রয়োজনে যেকোনো মুহুর্তে ছিলেন আস্থার প্রতীক। পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও সংগঠনের যেকোনো কর্মসূচিতে ফয়েজ ভাই সবার আগে হাজির থাকতেন। ব্যক্তিগত জীবনেও অত্যন্ত সময়ানুবর্তী ছিলেন ডা. ফয়েজ, কারণ সময়ানুবর্তিতার ব্যর্থতাকে চারিত্রিক দুর্বলতা মনে করতেন তিনি। চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের সেবার পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী পরবর্তীতে নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করা ছিল তাঁর জন্য অত্যন্ত দুরহ ব্যাপার। সেই কঠিন কাজটি শহীদ হবার আগে অত্যন্ত সাবলিলভাবে আনজাম দিয়েছেন তিনি।

দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা ছিল তাঁর সহজাত অভ্যাস। জেলা জামায়াতের সর্বশেষ কর্মপরিষদের বৈঠকেও তিনি নিজে বছরের প্রথম সভায় দারস দেয়ার আগ্রহ পোষণ করেন। সেই হিসেবে নতুন বছরের কর্ম পরিষদের প্রথম সভায় দারস দেবার কথা ছিল জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. ফয়েজ আহমদের। কিন্তু স্রষ্টার পরিকল্পনা ভিন্ন।

জামায়াত, শিবির, ছাত্রী সংস্থার প্রোগ্রামের দারসের অঘোষিত নিয়মিত মেহমান ছিলেন ডা. ফয়েজ। জীবনের শেষ মুহুর্তেও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চেয়েছেন তিনি।

ত্যাগ, কোরবানী, ঈমান, ইসলাম, ইহসান, আদল, আখিরাত, তাকওয়া সম্পর্কিত বিষয়গুলোই ছিলো তাঁর আলোচনার বিষয়। কারণ ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ইসলামের বিধিবিধানের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন।

লক্ষ্মীপুর বাস টার্মিনালের পাশে বাসা হওয়ার কারণে ডা. ফয়েজের চেম্বারে দুস্থ, অসহায় ও দরিদ্র শ্রমিকদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত দৃশ্য। তিনি তাদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাতেন। চিকিৎসক এবং রোগীর সম্পর্কের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিগত সখ্যতাকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের মাঝে তিনি দাওয়াতী কাজ করতেন। শ্রমিকদের মাঝে আন্দোলনের দাওয়াত প্রসারের ক্ষেত্রে জনাব ফয়েজের ভূমিকা অনন্য।

আন্দোলনের ভাইবোনদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে তিনি ছিলেন সবচাইতে অগ্রগামী। বিশেষ করে যেকোনো অসুস্থতায় সেবা নেবার ক্ষেত্রে ছিলেন সকলের প্রথম পছন্দ। আমাদের কাছে তিনি ছিলেন সর্ব স্পেশালিস্ট ডাক্তার। কারণ যেকোনো ক্ষেত্রে আমি লক্ষ্য করতাম সকলে আগে ডা. ফয়েজ সাহেবের কাছে পরামর্শ চাইতেন, তিনিও তাঁর অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার দরুণ বিভিন্ন সংঘর্ষে আহত ভাইদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ডা. ফয়েজ সাহেব ছিলেন সদা প্রস্তুত। ২০১৩ সালে লক্ষ্মীপুরে যৌথবাহিনী পরিচয়ধারী আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলার সময় তাঁকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেয়া হলে, তিনি বলেন- “আল্লাহ চাইলে কেউ আমার শাহাদাত ঠেকাতে পারবে না।” এই ধরনের সাহসী উচ্চারণ কেবল ডা. ফয়েজের মতো ঈমানদার লোকদের পক্ষেই বলা সম্ভব।

মোল্লা ভাইয়ের শাহাদাত পরবর্তী লক্ষ্মীপুরবাসী যখন শোকে মুহ্যমান সেই মুহুর্তে গভীর রাতে গেইট ভেঙে বাসায় প্রবেশ করে ভাঙচুর, লুটপাট ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মতো নৃশংসতা চালায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্বার্থ রক্ষাকারী যৌথবাহিনী। পরিবারের সদস্যদের সাথে অসদাচরণের এক পর্যায়ে অসুস্থ ফয়েজ ভাইকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে চারতলা ভবনটির ছাদে নিয়ে যায় ওরা। ছাদে দীর্ঘক্ষণ নির্যাতন করার পর ওরা গুলি করে আমাদের প্রিয় ডা. ফয়েজ ভাইকে হত্যা করে। র‌্যাবের ছদ্মাবরণে বাকশাল বাহিনী হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, এরপর চারতলার ছাদ থেকে ডা. ফয়েজের নিথর দেহখানা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সেদিন বাকশালীরা ফয়েজ ভাইয়ের মরদেহকে ছাদ থেকে ফেলে দেয়নি বরং মানবতা-মনুষ্যত্বকে তারা ফেলে দিয়েছে। আবদুল কাদের মোল্লা ভাইয়ের শাহাদাতের পর ফয়েজ ভাই আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে শাহাদাত কামনা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর দোয়া এত দ্রুত কবুল করবেন তা ভাবতেও পারিনি। সদাকর্মমূখর, জনহিতৈষী এক আলোকিত মানুষের প্রতিচ্ছবি ছিলেন ডা. ফয়েজ। পুরো জীবন যিনি দেশ, জাতি, মানুষ ও ইসলাম রক্ষায় প্রাণান্তকর সংগ্রাম করে বাংলাদেশসহ বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরবাসীকে ঋণী করে গেছেন।

সর্বশেষ শাহাদাতের নজরানা পেশের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের চিরঋণী করে গেছেন, বাংলার জমিনকে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার উপযোগী করে তোলার মাধ্যমেই শহীদ ডা. ফয়েজের ঋণ পরিশোধ সম্ভব। সে আলোকিত দিনের প্রত্যাশায়।

 

লেখক- আমীর, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, লক্ষ্মীপুর জেলা।

শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

© All rights reserved © 2021

Customized BY NewsTheme